টেংরাটিলা হয়ে উঠছে ‘মৃত্যুকূপ’

Sharing

অন্যকন্ঠ :   চুলায় লাকড়ি, খড়-কুটা কিংবা পাতাও নেই। তবু মাটির চুলায় কোনো কিছু ছাড়াই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে! প্রথমে দেখলে মনে হবে এই চুলার নিচে গায়েবি কিছু আছে তা না হলে এমন করে কীভাবে জ্বলছে?

তবে শুধু এই মাটির চুলা থেকে নয়, রাস্তা, পুকুর, খাল-বিল, মাঠ-জমি, টিউবওয়েল, বিদ্যালয় এমনকি বসতঘরের ভেতর দিয়ে বুদবুদ করে গ্যাস বের হচ্ছে। আর সামান্য আগুনের আঁচ পেলেই বুদবুদ করে বের হওয়া স্থানে আগুন ধরে যাচ্ছে। আর রাতে মানুষ কুপি জ্বালাতে দিয়াশলাইয়ের ম্যাচে টোকা দিলেই সারা ঘরের ফাটল দিয়ে আগুন ধরে যায়।

১০ বছর আগে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডে দুই দফা বিস্ফোরণের ঘটনার পর থেকে টেংরাটিলা গ্রামসহ আশপাশের গ্রামে এভাবে বিপুল পরিমাণ গ্যাস নষ্ট হচ্ছে। এতে টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, নূরপুর, সোনাপুর ও শান্তিপুর গ্রাম পরিণত হয়েছে মৃত্যুকূপে। সব সময় বিস্ফোরণ ও আগুন আতঙ্কে থাকতে হয় বাসিন্দাদের। রয়েছেন স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে।

সরজমিনে বিষয়টি দেখতে গেলে টেংরাটিলা গ্রামের জাহানারা বেগম জানান, তাঁর বসতঘরের সব দিকেই গ্যাস বের হয়। রান্না করার জন্য যে মাটির চুলাটি তিনি বানিয়েছেন সেই চুলা দিয়ে বেশি মাত্রায় গ্যাস বের হয়। তাই ওই চুলায় লাকড়ি ছাড়াই তিনি রান্নাবান্নার কাজ সেরে নেন। তবে ভয়ে থাকেন কখন পুরো ভিটায় বিস্ফোরণ ঘটে। কখন পুরো ঘরে দাউ দাউ করে আগুন লেগে যায়।

টেংরাটিলা গ্রামের আরেক বাসিন্দা আবুল হোসেন তাঁর বসতঘরের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দিয়ে গ্যাস বের হওয়ার দৃশ্য দেখান। ওই সব জায়গায় তিনি মোম জ্বালালে ফাটলের স্থানে আগুন ধরে যায়।

আবুল হোসেন জানালেন, এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে গ্যাস উদগিরণ হয় না। আর এই গ্যাস উদগিরণের ফলে মাঝেমধ্যেই ঘটে যাচ্ছে দুর্ঘটনা। যেমন : কিছু দিন আগে টেংরাটিলা গ্রামের ইব্রাহিম হোসেনের ছেলে মোক্তার হোসেন (৩০) সকালে শৌচাগারে গিয়ে সিগারেট জ্বালানোর জন্য ম্যাচে টোকা দিতেই পাইপ দিয়ে বের হতে থাকা গ্যাসে আগুন ধরে যায় এবং মোক্তার হোসেনের শরীরের বেশ কিছু অংশ পুড়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তিনি প্রায় এক মাস চিকিৎসা শেষে বাড়িতে আসেন। এখনো তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানের পোড়ার ঘা শুকোয়নি। এভাবেই টেংরাটিলার আশপাশের মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুকূপে বসবাস করছেন বলে জানালেন আবুল হোসেন।

২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন দুই দফা বিস্ফোরণে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন কূপের রিগ ভেঙে দুই দফা বিস্ফোরণে গ্যাসফিল্ডের গ্যাসের রিজার্ভ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর থেকে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

গত বছর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাপেক্সের কর্মকর্তারা টেংরাটিলা এসে জানিয়েছিলেন যে বেশি মাত্রায় বুদবুদ আকারে গ্যাস উদগিরণ হলেও বিস্ফোরণের আশঙ্কা নেই। তাই এলাকাবাসীকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করে যান তাঁরা। তবে বিস্ফোরণের আশঙ্কা না থাকলেও গ্যাসফিল্ডের আশপাশ দিয়ে গত এক মাসে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস উদগিরণ শুরু হয়েছে। গ্যাসফিল্ডের আশপাশের কয়েক গ্রামের টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক ও দুর্গন্ধ থাকায় ওই এলাকাগুলোয় তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে মরে যাচ্ছে গাছপালা। আর আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে এই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন গিরিশনগর গ্রামের গিয়াস উদ্দিন (৩৫), মোকলেছুর রহমান ফারাজী (৪০), আবদুল মতিন (৪২) ও শফিকুল ইসলাম (৩০)। আর এর ভয়াবহ রোগে আরো আক্রান্ত হচ্ছেন ওই এলাকার আরো অনেকেই।
আর্সেনিকে আক্রান্ত মোকলেছুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে পানি খেয়ে আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত হয়ে গেছে। হাতে ও পায়ের পাতায় গর্ত হয়ে গেছে।’

এই অবস্থায় ওই এলাকায় মানুষ আতঙ্কে রাতে ঘরে ঘুমাতে পারছেন না। সমস্যার সমাধানে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বারবার মানববন্ধন ও প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে এলাকাবাসীর  পক্ষ থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। সেই মিছিলে নাইকোকে এক মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এর মধ্যে নাইকো কিংবা সরকার যদি কোনো উদ্যোগ না নেয় তাহলে নাইকোর গেটে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন তাঁরা।

এ ব্যাপারে সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শাহজাহান মাস্টার বলেন, ‘টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড বিস্ফোরণের ১০ বছর হয়ে গেছে। বিস্ফোরণের পর নাইকো কর্তৃপক্ষ সামান্য কিছু ক্ষতি পূরণ দিয়েই চলে গেছে। অথচ গত ১০ বছরে এলাকার মানুষ নানা ক্ষয়-ক্ষাতির সম্মুখীন হয়েছে। পুরো এলাকায় এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। মানুষ রাতে ঘরে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ঘুমাতে পারে না, কখন ঘরে আগুন লেগে যায় এই আতঙ্কে। পানি খেতে পারে না আর্সেনিক ও দুর্গন্ধের কারণে। আমরা মানববন্ধন করছি। প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। তবু সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। তাই আমরা এক মাসের সময় বেঁধে দিয়েছি। যদি নাইকো কিংবা সরকার আমাদের কথা না শোনে আমাদের ব্যবস্থা আমরাই করব।’

সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক এবং ওই এলাকার বাসিন্দা ফয়জুর রহমান বলেন, ‘গত কয়েক মাসে তিনবার গ্যাসের উদগিরণ বেশি হয়েছে। গ্যাসের কারণে গাছপালা মরে যাচ্ছে। এলাকার সবগুলো টিউবওয়েলে ৬০০ শতাংশ মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে। কয়েক দফায় গাছ মরে যাওয়ার পর নতুন করে লাগানো গাছও মরে যাচ্ছে। মানুষ শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতায় ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে টেংরাটিলা এলাকায় বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। গ্যাস উদগিরণের ফলে এলাকায় মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নিলে এই এলাকায় টিকে থাকা দায় হয়ে পড়বে। তাই সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করে টেংরাটিলাকে বসবাসের উপযোগী করে তুলবে।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকাবাসী বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন করেছে। আমার কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে। আমরা বিষয়টি দেখছি কী করা যায়।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, নাইকোর সঙ্গে সরকারের মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। আর টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বিশেষজ্ঞ এসে টেংরাটিলা এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন এখনো আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু হয়নি।

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. রফিক আহমদ বলেন, এলাকায় গ্যাসের দুর্গন্ধ বেশি দিন থাকলে মানুষের শ্বাস কষ্টসহ নানা রকম চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তিনি এলাকার মানুষকে পুকুর কিংবা যেসব এলাকার পানিতে আর্সেনিক নেই ওই এলাকার টিউবঅয়েলের পানি পান করার পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে পরিবেশবাদীরা টেংরাটিলার গ্যাস উদগিরণের ফলে ওই এলাকার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। সুনামগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা কয়েকবার টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের আশপাশের কয়েক এলাকা পরিদর্শন করেছি। পুরো এলাকাজুড়ে গ্যাস বের হচ্ছে। এলাকায় দুর্গন্ধের জন্য থাকা যায় না। আরো আতঙ্কের বিষয় হলো সবগুলো টিউবঅয়েলের পানিতে আর্সেনিক থাকায় মানুষ পানি খেতে পারছে না। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। গাছপালা মরে যাচ্ছে। গাছে এসে পাখি বসে না। জলাশয় ও পুকুরে মাছ থাকে না। আর বৃষ্টির সময় পানি বাড়লে কিছু মাছ এলেও আবার চলে যায়। এই অবস্থায় ওই এলাকায় মানুয়ের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে একটা মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তিনি

Sharing